
‘১০ লাখ টাকা দিবেন। টাকা না দিলে প্রাইভেট কার হারাবেন। গাড়িতে পিস্তল দিয়া অস্ত্র মামলায় ফাঁসাব। প্রয়োজনে স্বর্ণ চোরাচালানের মামলাও খাবেন। মিডিয়া ডেকে ছবি তুলব। সেই ছবি দেখে সারা দেশের মানুষ জানবে আপনারা চোর। এখন ভাইবা দেখেন, টাকা দিবেন নাকি গাড়ি আর মান-ইজ্জত সবই হারাবেন।’ ব্যবসায়ী দম্পতির উদ্দেশে হুমকিগুলো দিয়েছে পুলিশের পোশাকধারী অপরাধী চক্রের সদস্যরা। ঘটনাটি ১৪ নভেম্বর রাতের। ঢাকার নবীনগরে পুলিশের পোশাকে কয়েকজন অস্ত্রধারী প্রাইভেট কারযোগে চলা অভিজাত ব্যবসায়ী দম্পতিকে তল্লাশির নামে রাস্তার পাশে দাঁড় করায়। এরপর তাদের নবীনগর মোড় থেকে মাইক্রোবাসে তুলে পাশের একটি নির্জন ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে হত্যা ও মামলার ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা, মালামাল লুট করে নেয়। প্রথম দফায় এটিএম কার্ডের মাধ্যমে বুথ থেকে ৪৫ হাজার টাকা তুলে দিয়ে মধ্যরাতে মুক্তি পেলেও দ্বিতীয় দফায় গাবতলীর মাজার রোড এলাকায় পুলিশের আরেকটি দলের খপ্পরে পড়েন তারা।
কেবল এ দম্পতি নয়, ঢাকা-মানিকগঞ্জের এ রুটের সাভার, হেমায়েতপুর, নবীনগর, মানিকগঞ্জ সদর ও পাটুরিয়া এলাকায় আরও অনেকেই ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ ও চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন। পেশাদার ডাকাত-ছিনতাইকারীরা তো আছেই। এখন পুলিশি পোশাক গায়ে লাগিয়েই মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নেয়া হচ্ছে। অনেক সময় এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পেশাদার অপরাধীরা কৌশল হিসেবে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা বলছেন, পেশাদার অপরাধীদের মতো এখন একশ্রেণীর পুলিশ সদস্য ওই সব অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে। হাইওয়েতে প্রাইভেট কার ছাড়াও প্রতি রাতে বাস, ট্রাক, কার্ভাডভ্যান ও মাইক্রোবাস আটকে ছিনতাই-ডাকাতি আর চাঁদাবাজি করছে অপরাধ চক্রে জড়িয়ে পড়া বেশকিছু পুলিশ সদস্য, যারা ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তার মদদে ছিনতাই-ডাকাতির মতো গুরুতর অপরাধ ঘটিয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগী সাবরিনা (ছদ্মনাম) আলোকিত বাংলাদেশকে জানান, তিনি ও তার স্বামী ব্যবসা করেন। তারা ব্যবসার কাজে ভারতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ১৪ নভেম্বর দেশে ফেরেন। বেনাপোল বন্দরে রাকিব নামে এক যুবকের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। তিনিও ঢাকায় ফিরবেন বলে জানান। সখ্য গড়ে ওঠায় রাকিবকে সঙ্গে নিয়েই বেনাপোল বন্দর থেকে নিজস্ব গাড়িতে তারা ঢাকা ফিরছিলেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তারা নবীনগর মোড়ে পৌঁছলে দুটি প্রাইভেট কার তাদের ব্যারিকেড দেয়। দুজন পুলিশের পোশাকে আর সাধারণ পোশাকে পাঁচ থেকে ছয়জন মাইক্রোবাস থেকে নেমে আসে। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে প্রাইভেট কারে থাকা স্বামীকে নামিয়ে নেয়। এরপর তাদের দুজনকে পৃথক দুটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে নির্জন রাস্তা দিয়ে যেতে থাকে। প্রায় ১০ মিনিট গাড়ি চলার পর একটি ডাম্পিং স্টেশনে গাড়ি থামে। এরপর সিভিল ড্রেসে থাকা ব্যক্তিরা বলে, আপনারা চোরাকারবার করেন। ভারত থেকে স্বর্ণ ও মালামাল এনেছেন। এখন ১০ লাখ টাকা দিলে ছাড়া পাবেন। বাসায় খবর দিয়ে ১০ লাখ টাকা নিয়ে আসতে বলেন। নইলে মামলায় ফাঁসিয়ে দেব। মিডিয়া ডেকে ছবি তুলে প্রকাশ করব। গাড়িও যাবে, সম্মানও খোয়াবেন। এ সময় তারা ভারত থেকে আনা জামা-কাপড়ের কাগজপত্র দেখাতে চাইলেও পুলিশ সদস্যরা তা দেখতে রাজি হয়নি।
ভুক্তভোগী সাবরিনা আরও জানান, তার পিতা বয়স্ক মানুষ। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তার পক্ষে ওই রাতে টাকা নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাদের কাছে অল্প কিছু রুপি আর ডলার ছিল। দুর্বৃত্তরা সেই ডলার ও রুপি নেয়ার পর তাদের দুজনের এটিএম কার্ড নেয়। এরপর তারা কার্ডের পিন নম্বর নিয়ে সাউথ-ইস্ট ব্যাংকের পাশের বুথ থেকে ৪৫ হাজার টাকা তোলে। দুর্র্বৃত্তরা অন্য দুটি এটিএম কার্ড দিয়েও অল্প কিছু টাকা তুলে নেয়। প্রায় চার ঘণ্টা আটকে রেখে রাত আড়াইটার দিকে তারা ছেড়ে দেয়। সাবনিরা বলেন, এ চার ঘণ্টা সব সময় মৃত্যু আতঙ্ক কাজ করছিল।
এ প্রসঙ্গে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোঃ বদরুল আলম বলেন, এমন ধরনের কোনো অভিযোগ আমার কাছে নেই। নবীনগর এলাকায় রাতে থানা পুলিশ ছাড়াও ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ দায়িত্ব পালন করে থাকে। কীভাবে এবং কারা ওই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে বলা মুশকিল। তবে অভিযোগ করলে তদন্তসাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভুক্তভোগী সাবনিরা জানান, নবীনগর এলাকা থেকে ছাড়া পেয়ে গাবতলীর মাজার রোড এলাকায় এসে পৌঁছলে পুলিশভ্যান দিয়ে তাদের গতিরোধ করা হয়। দ্বিতীয় দফায় যখন তাদের গতিরোধ করা হয়, তখন একজন পুলিশ সদস্য বলছিল, ‘এই গাড়িটাই, এইটাই আটকাতে হবে’। এখানেও পুলিশ সদস্যরা একইভাবে দাবি করে গাড়িতে অবৈধ মালামাল আছে। কাগজপত্র দেখাতে চাইলেও পুলিশ রাজি হয়নি। এ সময় মামলার ভয় দেখিয়ে তাদের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। তারা নবীনগর এলাকায় ডাকাতির শিকার হয়েছে বলে পুলিশকে জানায়। তখন পুলিশ বলে ওটা ঢাকা জেলা পুলিশ নিয়েছে, এটা ডিএমপি পুলিশের এরিয়া। আমাদেরও টাকা দিতে হবে। তিনি জানান, তখন এক আত্মীয়কে ফোন দেন তিনি। এ সময় ওই আত্মীয় বিভিন্ন জায়গা থেকে ১৭ হাজার টাকা এনে পুলিশকে দিলে ভোররাতে তারা মুক্তি পেয়ে বাসায় ফেরেন। ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) নিশারুল আরিফ বলেন, ঘটনাটি রহস্যজনক মনে হচ্ছে। এ ঘটনায় অভিযোগ দিলে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী জানান, সেদিন রাতে দুই দফা চাঁদা নিয়েও ক্ষান্ত হয়নি দুর্বৃত্তরা। এখন তাদের ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করে চাঁদা দাবি করছে। ভয়ে মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখলেও তারা হুমকি দিয়ে এসএমএস দিচ্ছে। ভয়ে পুলিশের কাছেও অভিযোগ করার সাহস পাচ্ছেন না তারা। মোবাইল ফোন বন্ধ রাখায় ঘটনার পরদিন তার মোবাইলে ০১৯৪১১৬৮০২২ নম্বর থেকে এসএমএস দেয়া হয়। তাতে বলা হয়, ফোন কতক্ষণ অফ রাখবেন। এ রোডে বিজনেস করলে আমার চোখ ফাঁকি দেয়া খুবই টাফ ব্যাপার। ওকে, কথা কম কাজ বেশি। এছাড়াও বিভিন্ন অপরিচিত নাম্বার থেকে তার মোবাইলে ফোন আসছে। এর মধ্যে ০১৮৩৫৫১৫৩৯৫ থেকে ১৭ বার ফোন করা হয়েছে। বর্তমানে এসব বিষয়ে ভয়ানক আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগী দম্পতি। এদিকে একই রুটে পুলিশের চাঁদাবাজির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন একাধিক ট্রাক মালিকও। তাদেরই একজন সাভারের ট্রাক মালিক মোহাম্মদ বাবুল মিয়া জানান, প্রতিদিনই হাইওয়েতে পুলিশের চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন ট্রাক মালিকরা। গত সপ্তাহে ঢাকা থেকে ধামরাই যাওয়ার পথে রাত ৩টার দিকে নবীনগর এলাকায় তার গাড়ি ধরে আশুলিয়া থানা পুলিশ। কোনো কারণ ছাড়াই তার ট্রাকের চালক মাসুদের কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। অনেক দরকষাকষির পর ৩ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়া পান ওই চালক।
:আলোকিত বাংলাদেশ
পাঠকের মতামত